
যাত্রাবাড়ী প্রতিনিধি জানিয়েছেন, তেল সংকটের কারণে সায়েদাবাদ বাস টার্মিনাল থেকে অধিকাংশ বাস চলাচল করতে পারছে না। বাস টার্মিনালেই অলস সময় কাটাচ্ছেন শ্রমিকরা। কাজ না থাকায় অনেক শ্রমিক মানবেতর দিন কাটাচ্ছেন। ঈদ সামনে রেখে তাদের চোখে-মুখে হতাশার ছাপ।
সরেজমিন গিয়ে জানা যায়, সায়েদাবাদ বাস টার্মিনাল থেকে দেশের দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের ৪০টি রুটে বাস চলাচল করে। এর মধ্যে একটি রুটে আগে শতাধিক বাস ছেড়ে যেত টার্মিনাল থেকে। বর্তমান পরিস্থিতিতে ৩৫ থেকে ৪০টি বাস ছেড়ে যায়। বাকি বাসগুলো টার্মিনালেই থেকে যায়। একইভাবে অন্য রুটের অসংখ্য বাস তেলের বিড়ম্বনায় চলাচল বন্ধ রেখেছে।
ঢাকা-সিলেট রুটের সাকিল বাস পরিবহণের চালক মনা মিয়া বলেন, আমাদের পরিবহণের আগে ৭০ থেকে ৮০টি বাস টার্মিনাল থেকে ছেড়ে যেত। তেলের সংকটের কারণে এখন ২৫ থেকে ৩০টি বাস ছেড়ে যায়। মনা বলেন, সায়েদাবাদ থেকে সিলেট যাওয়া-আসায় ১৪০ লিটার তেল প্রয়োজন। কিন্তু পাম্প থেকে তেল দেয় ২০ লিটার। বহু অনুরোধ করার পর ৩০ লিটার তেল দেয়। এরপর যাত্রাপথে পাম্প থেকে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করে আবার ২০ লিটার তেল নিই। এভাবেই পথে পথে তেল নিতে হয়। অনেক সময় পাম্প বন্ধ থাকলে খোলা তেল নিতে হয়।
ঢাকা-সিলেট সড়কের আল মোবারাকা বাসের চালক গুলজার বলেন, আগে সড়কে বাস চালিয়েছি রাস্তার দিকে তাকিয়ে। এখন চালাই সড়কের পাশে পাম্প কোথায় আছে সেদিকে তাকিয়ে। কারণ বাসে তেল আছে ২০ লিটার। গন্তব্যে পৌঁছাতে লাগবে ৭০ লিটার। বাকি ৫০ লিটার তেল তো লাগবে। না হলে বাস বন্ধ হয়ে যাবে।
বাস শ্রমিক হেলাল খোকন হাওলাদার বলেন, তেল সংকটের কারণে বাস ছেড়ে না যাওয়ায় বেতন পাচ্ছি না। টার্মিনালের হোটেলে বাকি ভাত খাচ্ছি। বাড়িতে টাকা দিতে পারছি না। ঈদের কেনাকাটার জন্য স্ত্রী-সন্তানরা টাকা চাচ্ছে, দিতে পারছি না।
এদিকে ঈদযাত্রার টিকিট না পেয়ে সাধারণ যাত্রীদের মধ্যে তীব্র অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। জামালপুর রুটের যাত্রী রিপন মাহমুদ বলেন, এই রুটের বাসগুলো এখন আর অগ্রিম টিকিট দিচ্ছে না। কাউন্টার থেকে জানানো হচ্ছে, যাত্রার ঠিক আগে টিকিট বিক্রি করা হবে। কিন্তু ঈদের ওই ভিড়ের মধ্যে টিকিট সংগ্রহ করা কতটা দুঃসাধ্য, তা কি তারা বোঝে? তিনি শঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, এখন যা ৩৫০ টাকা, তখন সেই ভাড়া হয়ে যাবে ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা। টাকা দিলেও টিকিট পাব কি না, তা নিয়ে সন্দেহ আছে।
লালমনিরহাটের যাত্রী জুয়েল রানা বলেন, আগে অনলাইনে টিকিট না পেলেও কাউন্টারে পাওয়া যেত। এবার অর্ধেক টিকিট অনলাইনে ছাড়ার পর মুহূর্তেই তা শেষ হয়ে গেছে। এখন কাউন্টারে গেলে বাড়তি ভাড়া চাওয়া হচ্ছে। সবচেয়ে বড় শঙ্কা হলো, বাস আদৌ ছাড়বে কি না, তা নিয়ে। সব সময় বাড়ি যাওয়ার সুযোগ হয় না। ঈদই একমাত্র ভরসা। আগে ভোগান্তি হতো সড়কে, আর এবার যাত্রা শুরুর আগেই টিকিট নিয়ে অনিশ্চয়তা শুরু হয়েছে।
অন্যদিকে বিপরীত চিত্র দেখা গেছে রাজধানীর গাবতলী বাস টার্মিনালে। মিরপুর প্রতিনিধি জানিয়েছেন, তেল সংকটের কারণে গাবতলী বাস টার্মিনালে তেমন প্রভাব পড়েনি। আগের মতোই টার্মিনাল থেকে দূরপাল্লার বাস ছেড়ে যাচ্ছে। পরিবহণসংশ্লিষ্টরা বলছেন, হানিফ, সোহাগ, শ্যামলী, খালেক, রোজিনা ও সেবা গ্রীনলাইন পরিবহণের নিজস্ব তেলের পাম্প রয়েছে। এজন্য তাদের রেশনিং করে তেল নিতে হচ্ছে না। তারা চাহিদামাফিক তেল পাচ্ছে। মঙ্গলবার গাবতলী বাস টার্মিনালে একাধিক বাস মালিক ও স্টাফের সঙ্গে কথা হয়। তারা জানান,গাবতলীতে তেল সংকটের তেমন প্রভাব পড়েনি। সময়মতো বাস ছেড়ে যাচ্ছে, তবে যাত্রী কম।
এদিকে তেল সংকটের কারণে মিরপুরের বেশির ভাগ জায়গায় সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত পেট্রোল পাম্প বন্ধ রাখা হয়েছে। এর মধ্যে দু-একটি খোলা থাকলেও তেল নিতে আসা বিভিন্ন যানবাহনের দীর্ঘ লাইনে ছিল চরম ভোগান্তি।
পুরান ঢাকা প্রতিনিধি জানিয়েছেন, সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনাল থেকে যাত্রীদের সেবা দিতে চালু করা হয়েছে বিশেষ লঞ্চ। তবে এখনো লাগেনি বাড়ি ফেরার হিড়িক। এমনকি অগ্রিম টিকিট বিক্রিতেও কাক্সিক্ষত সাড়া মেলেনি বলে জানিয়েছেন লঞ্চের স্টাফরা। সোমবার টার্মিনাল ঘুরে দেখা যায়, বিভিন্ন কাউন্টারে অগ্রিম টিকিটের ব্যবস্থা থাকলেও এখনো আসছেন না টিকিট ক্রেতারা। লঞ্চ মালিকরাও ঢিলেঢালাভাবে চালাচ্ছেন কাউন্টারগুলো।
লঞ্চ কাউন্টার ম্যানেজার আমিনুল ইসলাম নয়ন বলেন, যাত্রী এলে আমরা অগ্রিম কেবিন দিচ্ছি। ব্যাগ-লাগেজ একদম ফ্রি বহন করবে, কোনো ধরনের টাকা দিতে হবে না। আমাদের যাত্রী দরকার। এমনিতেই লঞ্চ কমে গেছে। যাওয়া-আসার দুটো টিকিটই দেওয়া হচ্ছে। এ পর্যন্ত ঈদের আগের ৩ দিনের জন্য কোনো টিকিট বিক্রি করতে পারিনি। আশা করছি, সপ্তাহখানেকের মধ্যেই কেবিন বিক্রি শুরু হয়ে যাবে।