ঢাকা ০৩:০৯ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ০৩ অগাস্ট ২০২৬, ১৮ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

গণভোট অধ্যাদেশ বাতিলের প্রস্তাব

  • রিপোর্টার
  • আপডট টাইম : ০২:৫৪:১১ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৬ মার্চ ২০২৬
  • ১৬৮ পঠিত

গণভোট অধ্যাদেশ বাতিলের প্রস্তাব

জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশের ওপর গণভোট হয়েছে যে অধ্যাদেশে, সেই ‘গণভোট অধ্যাদেশ-২০২৫’ নিয়ে টানাপোড়েন দেখা দিয়েছে। জামায়াতের ভাষ্য, ক্ষমতাসীন দল বিএনপি অধ্যাদেশটি বাতিলের প্রস্তাব করেছে। এতে তারা আপত্তি জানিয়েছে। তবে সরকারি দলের ভাষ্য, তারা অধ্যাদেশটি বাতিল বা গ্রহণের সিদ্ধান্ত নেয়নি,আলোচনা চলছে।

গতকাল বুধবার জাতীয় সংসদে বিশেষ কমিটির সভা শেষে পরস্পরবিরোধী এই ভাষ্য জানিয়েছে সরকারি দল বিএনপি ও বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামী।

১৪ সদস্যের এ কমিটি ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন সরকারের জারি করা ১৩৩ অধ্যাদেশ যাচাই-বাছাই করছে। এ কমিটির ১১ সদস্য বিএনপির। তিনজন জামায়াতের। ১৩৩টি অধ্যাদেশের মধ্যে ১১৩টি জাতীয় সংসদে পাস করাতে একমত হয়েছে সরকারি ও বিরোধী দল।

সূত্রটি জানায়, ২০টি অধ্যাদেশের বিষয়ে এখনও একমত হতে পারেনি বিশেষ কমিটি। আগামী ২৯ মার্চ কমিটির তৃতীয় বৈঠক হবে।
সংবিধানের ৯৩ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, অধ্যাদেশ জারির পর তা পরবর্তী সংসদ অধিবেশনে উত্থাপন এবং ৩০ দিনের মধ্যে পাস না হলে তা বাতিল হয়ে যাবে। ইউনূস সরকারের ১৩৩ অধ্যাদেশ গত ১৩ মার্চ সংসদে উত্থাপন করা হয়েছে। আগামী ১২ এপ্রিলের মধ্যে অধ্যাদেশগুলো পাস হতে হবে।

বিশেষ কমিটির বৈঠক সূত্র জানায়, গণভোট ছাড়াও সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগ, গুম প্রতিরোধ, দুর্নীতি দমন কমিশন এবং মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশেও বিএনপি পরিবর্তন আনতে চাইছে। বিরোধী দলের দাবি, পরিবর্তন বা আলোচনার জন্য সংসদে উত্থাপনের মাধ্যমে এসব অধ্যাদেশ বাতিল করতে চাইছে সরকারি দল। এর মাধ্যমে আগের মতো প্রধানমন্ত্রীর হাতে একচ্ছত্র ক্ষমতা রাখতে চায়, যা জুলাই সনদের লঙ্ঘন।

গতকাল বিশেষ কমিটির বৈঠকের পর জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য রফিকুল ইসলাম খান বলেন, গণভোট অধ্যাদেশ বাতিলে আইন মন্ত্রণালয় থেকে প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। এতে বিরোধী দল আপত্তি জানিয়েছে।

জামায়াতের আরেক এমপি জিএম নজরুল ইসলাম বলেন, বিএনপির আচরণে মনে হচ্ছে, তারা গণভোট বাতিল করতে চায়। তারা বলছে, গণভোটের বিধান সংবিধানে নেই। তাই গণভোট আয়োজন করা বৈধ কিনা– এই আলোচনা সংসদে হওয়া উচিত।

রফিকুল ইসলাম খান জানান, ক্ষমতাসীন দলের পক্ষ থেকে দুর্নীতি দমন কমিশন অধ্যাদেশ, জাতীয় মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশ, পুলিশ কমিশন অধ্যাদেশ এবং গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার অধ্যাদেশেও সংশোধনের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। তবে এসব অধ্যাদেশ নিয়ে এখনও আলোচনা হয়নি।

বিশেষ কমিটির বৈঠকে বিরোধী দলের কী অবস্থান ছিল– এমন প্রশ্নে নজরুল ইসলাম বলেছেন, গণভোট অধ্যাদেশ সংশোধনের নামে সংসদে উত্থাপন মানেই সরকারি দলের সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে তা বাতিল হতে দেওয়া। এর মানে জুলাই গণঅভ্যুত্থানকে বাতিল করা। বিরোধী দল তা হতে দেবে না।
তিনি আরও বলেন, গণভোট হয়ে গেছে। এখন অধ্যাদেশ সংশোধনের প্রয়োজন নেই। ভবিষ্যতে এই অধ্যাদেশের মাধ্যমে আর গণভোট হওয়ার সম্ভাবনা নেই। তাই সংশোধন প্রস্তাবই আদতে অধ্যাদেশটি বাতিল করার পাঁয়তারা।

তবে কমিটির সভাপতি ও সরকারি দলের সংসদ সদস্য জয়নুল আবেদীন দাবি করেছেন, গণভোট বাতিল বা রাখার পক্ষে-বিপক্ষে তারা কোনো অবস্থান নেননি।
এ ছাড়া আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান গতকাল রাতে বলেন, বিষয়টি এখনও আলোচনার টেবিলে। এখনও সিদ্ধান্ত হয়নি।

গণভোট অধ্যাদেশ ঝুলে আছে

গত ১৩ নভেম্বর অন্তর্বর্তী সরকারের অনুমোদনে রাষ্ট্রপতি জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশ জারি করেন। ২৫ নভেম্বর জারি করা হয় গণভোট অধ্যাদেশ। ১২ ফেব্রুয়ারি সংসদ নির্বাচনের দিনে আদেশের ওপর গণভোট হয়। ৬৮ শতাংশের বেশি ভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়লাভ করে।

রাজনৈতিক দলগুলোর স্বাক্ষরিত জুলাই সনদের ৪৮টিতে সংবিধান সংস্কারের প্রস্তাব রয়েছে। গত সেপ্টেম্বর ও অক্টোবরে রাজনৈতিক দলগুলোর তৃতীয় দফার সংলাপে জুলাই সনদ বাস্তবায়নে ছয়টি পদ্ধতির প্রস্তাব করা হয়েছিল। সংখ্যাগরিষ্ঠ রাজনৈতিক দলের মতামতে, সনদ বাস্তবায়নে আদেশ জারি এবং আদেশের ওপর গণভোট আয়োজনের সুপারিশ করে সাবেক ঐকমত্য কমিশন। বর্তমান আইনমন্ত্রী তখন ছিলেন অ্যাটর্নি জেনারেল। তিনিও একই অভিমত দিয়েছিলেন। বিএনপি ওই সময় গণভোটে একমত হলেও সংবিধানে নেই– যুক্তিতে আদেশ জারির বিপক্ষে ছিল।

আদেশে বলা হয়েছিল, হ্যাঁ জয়ী হলে ত্রয়োদশ সংসদ দ্বৈত ভূমিকা পালন করবে। নির্বাচিত এমপিদের নিয়ে ১৮০ কার্যদিবস মেয়াদি সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন করতে হবে। এ পরিষদ গণভোটের ফল অনুযায়ী, তত্ত্বাবধায়ক সরকার, নির্বাচন কমিশন, সরকারি কর্ম কমিশন, মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক, ন্যায়পাল এবং দুর্নীতি দমন কমিশন গঠনের বিধান সংবিধানে যুক্ত করবে। ভোটের অনুপাতে (পিআর) সংবিধান সংশোধনের ক্ষমতা দিয়ে ১০০ আসনের উচ্চকক্ষ গঠন করবে। এসব ছাড়াও জুলাই সনদের যে ৩০ সংস্কার প্রস্তাবে সব দলের ঐকমত্য হয়েছিল, সেগুলো বাস্তবায়ন করবে।

নির্বাচনে বিজয়ী হবার পর বিএনপি সংবিধান সংস্কার পরিষদের শপথ নেয়নি। দলটি জুলাই সনদে তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠন পদ্ধতি, পিআর পদ্ধতিতে উচ্চকক্ষ গঠন, দুদক এবং সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোর নিয়োগ পদ্ধতিতে নোট অব ডিসেন্ট (ভিন্নমত) দিয়েছিল। সংসদে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়া বিএনপি নোট অব ডিসেন্ট অনুযায়ী জুলাই সনদ বাস্তবায়ন করতে চায়। অন্যদিকে বিরোধী জোট গণভোটের রায় অনুযায়ী জুলাই সনদ বাস্তবায়ন চায়।

সরকারি দল সরাসরি বলছে না
বিএনপির পক্ষ থেকে দাবি করা হচ্ছে, গণভোট নিয়ে বৈঠকে তেমন আলোচনা হয়নি। কমিটির সভাপতি জয়নুল আবেদীন সাংবাদিকদের বলেন, গণভোট বিষয়ে বৈঠকে তেমন আলোচনা হয়নি। এটা নিয়ে ২৯ মার্চ পরবর্তী বৈঠকে আলোচনা হবে অথবা সংসদের বৈঠকে আলোচনা হবে।

গণভোট অধ্যাদেশ নিয়ে বিএনপির দলীয় অবস্থান সম্পর্কে জানতে চাইলে জয়নুল আবেদীন বলেন, এটা সংসদের বিষয়। বিশেষ কমিটি এ বিষয়ে ঐকমত্য হতে না পারলে সংসদের বৈঠকে আলোচনা হবে।

সরকারি দল থেকে গণভোট অধ্যাদেশ রহিত করার প্রস্তাব করা হয়েছে কিনা– এমন প্রশ্নের জবাবে জয়নুল আবেদীন বলেন, তাদের পক্ষ থেকে রহিত করার প্রস্তাব করা হয়নি, আবার রাখার প্রস্তাবও করা হয়নি। তারা বলেছেন, এটা নিয়ে আলোচনা হতে পারে। সংবিধানের আলোকে এগুলো আলোচনা করতে হবে। কারণ সংবিধান সবার ঊর্ধ্বে। সংসদ সংবিধান অনুযায়ী চলবে। সে জন্য গণভোটসহ সবকিছু আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে শেষ করতে চান তারা।

বৈঠকে উপস্থিত চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনিও গতকাল সন্ধ্যায় বলেন, আলোচনা চলমান। গণভোট বাতিলের প্রস্তাব কার পক্ষ থেকে দেওয়া হয়েছে– এমন প্রশ্নের জবাব এড়িয়ে গিয়ে তিনি বলেন, ‘একটা গ্লাসের অর্ধেক পানি দেখে কেউ একজন বলতে পারে অর্ধেক খালি; আবার আরেকজন বলতে পারে অর্ধেক ভরা।’

বৈঠকে উপস্থিত একাধিক সূত্রে জানা গেছে, গণভোট অধ্যাদেশের বিষয়ে আইন মন্ত্রণালয় থেকে বলা হয়েছে, যে আদেশের ওপর গণভোট হয়েছে, তা ছিল এখতিয়ারবহির্ভূত। সুতরাং অধ্যাদেশকে আইনে পরিণত করা যাবে না। রফিকুল ইসলাম খান বলেছেন, ৭০ শতাংশ মানুষ গণভোটে হ্যাঁ ভোট দিয়েছেন। তাই এটা পাস না করা জনগণের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতার শামিল।

১৩৩ অধ্যাদেশকে তিন ভাগে ভাগ করা হয়েছে জানিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেন, এক ভাগ হচ্ছে অধ্যাদেশগুলো যেভাবে জারি হয়েছিল, সেভাবে পাস করা হবে। আর কিছু অধ্যাদেশে সংশোধনী আনা হবে, সেভাবে পাস হবে। আর কিছু অধ্যাদেশ এই অধিবেশনে বাতিল হয়ে যাবে; পরে যদি প্রয়োজন হয়, তা বিল আকারে পরবর্তী অধিবেশনে উত্থাপন করা যাবে। অধ্যাদেশ পর্যালোচনার ক্ষেত্রে ‘জুলাই সনদ’ এবং ‘সাংবিধানিকতা’– এ দুই বিষয়কে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশ, গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার অধ্যাদেশ এবং মানবাধিকার-সংক্রান্ত অধ্যাদেশেও সংশোধনের সুপারিশ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় থেকে বৈঠকে করা হয় বলে জানা গেছে। নজরুল ইসলাম বলেছেন, বিরোধী দলের বিরোধিতায় এসব অধ্যাদেশ নিয়ে পরে আলোচনার সিদ্ধান্ত জানায় সরকারি দল।

ক্ষমতা কুক্ষিগতের অভিযোগ বিরোধীদের 
ইউনূস সরকারের জারি করা ‘সুপ্রিম কোর্টে বিচারক নিয়োগ অধ্যাদেশ’-এর মাধ্যমে উচ্চ আদালতে বিচারপতি নিয়োগে প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা খর্ব করা হয়। এই অধ্যাদেশ সংশোধনের মাধ্যমে সরকারি দল আবারও প্রধানমন্ত্রীর কাছে বিচারক নিয়োগের ক্ষমতা নিতে চাইছে বলে অভিযোগ করেছেন জামায়াত নেতা রফিকুল ইসলাম খান।

সংসদে সরকারি দলের সংখ্যাগরিষ্ঠতার বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে রফিকুল ইসলাম খান বলেন, দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে অতীতের সরকার অনেক কিছু করেছে। কিন্তু সেই অহংকার জাতির জন্য ভালো কিছু বয়ে আনে না। সংস্কার ও বিচারের ম্যান্ডেট নিয়ে এই সরকার এসেছিল। গুম কমিশন বা মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশের মাধ্যমে যে অর্জনগুলো হয়েছে, তা ক্ষতিগ্রস্ত করা জনগণ মেনে নেবে না।

দুর্নীতি দমন কমিশনের অধ্যাদেশ সংশোধনের মাধ্যমে চেয়ারম্যান নিয়োগে সার্চ কমিটির ক্ষমতা খর্ব করা হচ্ছে অভিযোগ করে বিরোধীদলীয় এই হুইপ বলেন, সরকার যাকে ইচ্ছা তাকে নিয়োগ দেওয়ার ক্ষমতা নিতে চাইছে। একইভাবে পুলিশ কমিশনার এবং আইজিপি নিয়োগেও পেশাদারিত্বের চেয়ে সরকারের পছন্দকে প্রাধান্য দেওয়ার চেষ্টা চলছে। জামায়াত বলেছে, এসব সংশোধনী প্রস্তাব জুলাই চেতনার পরিপন্থি।

জুলাই সনদ মানার কথা বলছে সরকার
আইনমন্ত্রী আসাদুজ্জামান দাবি করেন, সরকার এখন পর্যন্ত জুলাই সনদের বাইরে পদক্ষেপ নেয়নি। তিনি বলেন, জুলাই সনদ সবার কাছে স্পর্শকাতর এবং সম্মানের। জুলাই সনদের শর্তই হলো ১ থেকে ৪৮ পর্যন্ত প্রস্তাব বাস্তবায়ন সংবিধান সংশোধন সাপেক্ষে।

তাহলে আপনারা কোনটাকে প্রাধান্য দেবেন– এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, সংবিধান ও জুলাই সনদকে প্রাধান্য দিচ্ছি। সংবিধান এবং জুলাই সনদকে এড়িয়ে কোনো কিছু করতে গেলে সেটা নিয়ে পরবর্তী বৈঠকে আলোচনা হবে।

গণভোটে বলা আছে; হ্যাঁ জয়যুক্ত হলে সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠিত হবে– এমন প্রশ্নের জবাবে আইনমন্ত্রী বলেন, ওইটা জুলাই সনদের পরিপন্থি।

গতকালের বৈঠকে কমিটির সভাপতি জয়নুল আবেদীনের সভাপতিত্বে আরও অংশ নেন সালাহউদ্দিন আহমেদ, নূরুল ইসলাম মনি, আসাদুজ্জামান, ড. মুহাম্মদ ওসমান ফারুক, এ এম মাহবুব উদ্দিন, জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী আব্দুল বারী, মুহাম্মদ নওশাদ জমির, সমাজকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী ফারজানা শারমীন, মুজিবুর রহমান, রফিকুল ইসলাম খান এবং জিএম নজরুল ইসলাম। বিশেষ আমন্ত্রণে উপস্থিত ছিলেন জামায়াতের দলীয় এমপি মোহাম্মদ নাজিবুর রহমান।

আরও পড়ুন 

জনপ্রিয় সংবাদ

সততা ও প্রশাসনিক স্বচ্ছতার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত চরফ্যাশনের ইউএনও রোমান আফরোজ

গণভোট অধ্যাদেশ বাতিলের প্রস্তাব

আপডট টাইম : ০২:৫৪:১১ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৬ মার্চ ২০২৬

জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশের ওপর গণভোট হয়েছে যে অধ্যাদেশে, সেই ‘গণভোট অধ্যাদেশ-২০২৫’ নিয়ে টানাপোড়েন দেখা দিয়েছে। জামায়াতের ভাষ্য, ক্ষমতাসীন দল বিএনপি অধ্যাদেশটি বাতিলের প্রস্তাব করেছে। এতে তারা আপত্তি জানিয়েছে। তবে সরকারি দলের ভাষ্য, তারা অধ্যাদেশটি বাতিল বা গ্রহণের সিদ্ধান্ত নেয়নি,আলোচনা চলছে।

গতকাল বুধবার জাতীয় সংসদে বিশেষ কমিটির সভা শেষে পরস্পরবিরোধী এই ভাষ্য জানিয়েছে সরকারি দল বিএনপি ও বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামী।

১৪ সদস্যের এ কমিটি ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন সরকারের জারি করা ১৩৩ অধ্যাদেশ যাচাই-বাছাই করছে। এ কমিটির ১১ সদস্য বিএনপির। তিনজন জামায়াতের। ১৩৩টি অধ্যাদেশের মধ্যে ১১৩টি জাতীয় সংসদে পাস করাতে একমত হয়েছে সরকারি ও বিরোধী দল।

সূত্রটি জানায়, ২০টি অধ্যাদেশের বিষয়ে এখনও একমত হতে পারেনি বিশেষ কমিটি। আগামী ২৯ মার্চ কমিটির তৃতীয় বৈঠক হবে।
সংবিধানের ৯৩ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, অধ্যাদেশ জারির পর তা পরবর্তী সংসদ অধিবেশনে উত্থাপন এবং ৩০ দিনের মধ্যে পাস না হলে তা বাতিল হয়ে যাবে। ইউনূস সরকারের ১৩৩ অধ্যাদেশ গত ১৩ মার্চ সংসদে উত্থাপন করা হয়েছে। আগামী ১২ এপ্রিলের মধ্যে অধ্যাদেশগুলো পাস হতে হবে।

বিশেষ কমিটির বৈঠক সূত্র জানায়, গণভোট ছাড়াও সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগ, গুম প্রতিরোধ, দুর্নীতি দমন কমিশন এবং মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশেও বিএনপি পরিবর্তন আনতে চাইছে। বিরোধী দলের দাবি, পরিবর্তন বা আলোচনার জন্য সংসদে উত্থাপনের মাধ্যমে এসব অধ্যাদেশ বাতিল করতে চাইছে সরকারি দল। এর মাধ্যমে আগের মতো প্রধানমন্ত্রীর হাতে একচ্ছত্র ক্ষমতা রাখতে চায়, যা জুলাই সনদের লঙ্ঘন।

গতকাল বিশেষ কমিটির বৈঠকের পর জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য রফিকুল ইসলাম খান বলেন, গণভোট অধ্যাদেশ বাতিলে আইন মন্ত্রণালয় থেকে প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। এতে বিরোধী দল আপত্তি জানিয়েছে।

জামায়াতের আরেক এমপি জিএম নজরুল ইসলাম বলেন, বিএনপির আচরণে মনে হচ্ছে, তারা গণভোট বাতিল করতে চায়। তারা বলছে, গণভোটের বিধান সংবিধানে নেই। তাই গণভোট আয়োজন করা বৈধ কিনা– এই আলোচনা সংসদে হওয়া উচিত।

রফিকুল ইসলাম খান জানান, ক্ষমতাসীন দলের পক্ষ থেকে দুর্নীতি দমন কমিশন অধ্যাদেশ, জাতীয় মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশ, পুলিশ কমিশন অধ্যাদেশ এবং গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার অধ্যাদেশেও সংশোধনের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। তবে এসব অধ্যাদেশ নিয়ে এখনও আলোচনা হয়নি।

বিশেষ কমিটির বৈঠকে বিরোধী দলের কী অবস্থান ছিল– এমন প্রশ্নে নজরুল ইসলাম বলেছেন, গণভোট অধ্যাদেশ সংশোধনের নামে সংসদে উত্থাপন মানেই সরকারি দলের সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে তা বাতিল হতে দেওয়া। এর মানে জুলাই গণঅভ্যুত্থানকে বাতিল করা। বিরোধী দল তা হতে দেবে না।
তিনি আরও বলেন, গণভোট হয়ে গেছে। এখন অধ্যাদেশ সংশোধনের প্রয়োজন নেই। ভবিষ্যতে এই অধ্যাদেশের মাধ্যমে আর গণভোট হওয়ার সম্ভাবনা নেই। তাই সংশোধন প্রস্তাবই আদতে অধ্যাদেশটি বাতিল করার পাঁয়তারা।

তবে কমিটির সভাপতি ও সরকারি দলের সংসদ সদস্য জয়নুল আবেদীন দাবি করেছেন, গণভোট বাতিল বা রাখার পক্ষে-বিপক্ষে তারা কোনো অবস্থান নেননি।
এ ছাড়া আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান গতকাল রাতে বলেন, বিষয়টি এখনও আলোচনার টেবিলে। এখনও সিদ্ধান্ত হয়নি।

গণভোট অধ্যাদেশ ঝুলে আছে

গত ১৩ নভেম্বর অন্তর্বর্তী সরকারের অনুমোদনে রাষ্ট্রপতি জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশ জারি করেন। ২৫ নভেম্বর জারি করা হয় গণভোট অধ্যাদেশ। ১২ ফেব্রুয়ারি সংসদ নির্বাচনের দিনে আদেশের ওপর গণভোট হয়। ৬৮ শতাংশের বেশি ভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়লাভ করে।

রাজনৈতিক দলগুলোর স্বাক্ষরিত জুলাই সনদের ৪৮টিতে সংবিধান সংস্কারের প্রস্তাব রয়েছে। গত সেপ্টেম্বর ও অক্টোবরে রাজনৈতিক দলগুলোর তৃতীয় দফার সংলাপে জুলাই সনদ বাস্তবায়নে ছয়টি পদ্ধতির প্রস্তাব করা হয়েছিল। সংখ্যাগরিষ্ঠ রাজনৈতিক দলের মতামতে, সনদ বাস্তবায়নে আদেশ জারি এবং আদেশের ওপর গণভোট আয়োজনের সুপারিশ করে সাবেক ঐকমত্য কমিশন। বর্তমান আইনমন্ত্রী তখন ছিলেন অ্যাটর্নি জেনারেল। তিনিও একই অভিমত দিয়েছিলেন। বিএনপি ওই সময় গণভোটে একমত হলেও সংবিধানে নেই– যুক্তিতে আদেশ জারির বিপক্ষে ছিল।

আদেশে বলা হয়েছিল, হ্যাঁ জয়ী হলে ত্রয়োদশ সংসদ দ্বৈত ভূমিকা পালন করবে। নির্বাচিত এমপিদের নিয়ে ১৮০ কার্যদিবস মেয়াদি সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন করতে হবে। এ পরিষদ গণভোটের ফল অনুযায়ী, তত্ত্বাবধায়ক সরকার, নির্বাচন কমিশন, সরকারি কর্ম কমিশন, মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক, ন্যায়পাল এবং দুর্নীতি দমন কমিশন গঠনের বিধান সংবিধানে যুক্ত করবে। ভোটের অনুপাতে (পিআর) সংবিধান সংশোধনের ক্ষমতা দিয়ে ১০০ আসনের উচ্চকক্ষ গঠন করবে। এসব ছাড়াও জুলাই সনদের যে ৩০ সংস্কার প্রস্তাবে সব দলের ঐকমত্য হয়েছিল, সেগুলো বাস্তবায়ন করবে।

নির্বাচনে বিজয়ী হবার পর বিএনপি সংবিধান সংস্কার পরিষদের শপথ নেয়নি। দলটি জুলাই সনদে তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠন পদ্ধতি, পিআর পদ্ধতিতে উচ্চকক্ষ গঠন, দুদক এবং সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোর নিয়োগ পদ্ধতিতে নোট অব ডিসেন্ট (ভিন্নমত) দিয়েছিল। সংসদে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়া বিএনপি নোট অব ডিসেন্ট অনুযায়ী জুলাই সনদ বাস্তবায়ন করতে চায়। অন্যদিকে বিরোধী জোট গণভোটের রায় অনুযায়ী জুলাই সনদ বাস্তবায়ন চায়।

সরকারি দল সরাসরি বলছে না
বিএনপির পক্ষ থেকে দাবি করা হচ্ছে, গণভোট নিয়ে বৈঠকে তেমন আলোচনা হয়নি। কমিটির সভাপতি জয়নুল আবেদীন সাংবাদিকদের বলেন, গণভোট বিষয়ে বৈঠকে তেমন আলোচনা হয়নি। এটা নিয়ে ২৯ মার্চ পরবর্তী বৈঠকে আলোচনা হবে অথবা সংসদের বৈঠকে আলোচনা হবে।

গণভোট অধ্যাদেশ নিয়ে বিএনপির দলীয় অবস্থান সম্পর্কে জানতে চাইলে জয়নুল আবেদীন বলেন, এটা সংসদের বিষয়। বিশেষ কমিটি এ বিষয়ে ঐকমত্য হতে না পারলে সংসদের বৈঠকে আলোচনা হবে।

সরকারি দল থেকে গণভোট অধ্যাদেশ রহিত করার প্রস্তাব করা হয়েছে কিনা– এমন প্রশ্নের জবাবে জয়নুল আবেদীন বলেন, তাদের পক্ষ থেকে রহিত করার প্রস্তাব করা হয়নি, আবার রাখার প্রস্তাবও করা হয়নি। তারা বলেছেন, এটা নিয়ে আলোচনা হতে পারে। সংবিধানের আলোকে এগুলো আলোচনা করতে হবে। কারণ সংবিধান সবার ঊর্ধ্বে। সংসদ সংবিধান অনুযায়ী চলবে। সে জন্য গণভোটসহ সবকিছু আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে শেষ করতে চান তারা।

বৈঠকে উপস্থিত চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনিও গতকাল সন্ধ্যায় বলেন, আলোচনা চলমান। গণভোট বাতিলের প্রস্তাব কার পক্ষ থেকে দেওয়া হয়েছে– এমন প্রশ্নের জবাব এড়িয়ে গিয়ে তিনি বলেন, ‘একটা গ্লাসের অর্ধেক পানি দেখে কেউ একজন বলতে পারে অর্ধেক খালি; আবার আরেকজন বলতে পারে অর্ধেক ভরা।’

বৈঠকে উপস্থিত একাধিক সূত্রে জানা গেছে, গণভোট অধ্যাদেশের বিষয়ে আইন মন্ত্রণালয় থেকে বলা হয়েছে, যে আদেশের ওপর গণভোট হয়েছে, তা ছিল এখতিয়ারবহির্ভূত। সুতরাং অধ্যাদেশকে আইনে পরিণত করা যাবে না। রফিকুল ইসলাম খান বলেছেন, ৭০ শতাংশ মানুষ গণভোটে হ্যাঁ ভোট দিয়েছেন। তাই এটা পাস না করা জনগণের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতার শামিল।

১৩৩ অধ্যাদেশকে তিন ভাগে ভাগ করা হয়েছে জানিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেন, এক ভাগ হচ্ছে অধ্যাদেশগুলো যেভাবে জারি হয়েছিল, সেভাবে পাস করা হবে। আর কিছু অধ্যাদেশে সংশোধনী আনা হবে, সেভাবে পাস হবে। আর কিছু অধ্যাদেশ এই অধিবেশনে বাতিল হয়ে যাবে; পরে যদি প্রয়োজন হয়, তা বিল আকারে পরবর্তী অধিবেশনে উত্থাপন করা যাবে। অধ্যাদেশ পর্যালোচনার ক্ষেত্রে ‘জুলাই সনদ’ এবং ‘সাংবিধানিকতা’– এ দুই বিষয়কে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশ, গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার অধ্যাদেশ এবং মানবাধিকার-সংক্রান্ত অধ্যাদেশেও সংশোধনের সুপারিশ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় থেকে বৈঠকে করা হয় বলে জানা গেছে। নজরুল ইসলাম বলেছেন, বিরোধী দলের বিরোধিতায় এসব অধ্যাদেশ নিয়ে পরে আলোচনার সিদ্ধান্ত জানায় সরকারি দল।

ক্ষমতা কুক্ষিগতের অভিযোগ বিরোধীদের 
ইউনূস সরকারের জারি করা ‘সুপ্রিম কোর্টে বিচারক নিয়োগ অধ্যাদেশ’-এর মাধ্যমে উচ্চ আদালতে বিচারপতি নিয়োগে প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা খর্ব করা হয়। এই অধ্যাদেশ সংশোধনের মাধ্যমে সরকারি দল আবারও প্রধানমন্ত্রীর কাছে বিচারক নিয়োগের ক্ষমতা নিতে চাইছে বলে অভিযোগ করেছেন জামায়াত নেতা রফিকুল ইসলাম খান।

সংসদে সরকারি দলের সংখ্যাগরিষ্ঠতার বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে রফিকুল ইসলাম খান বলেন, দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে অতীতের সরকার অনেক কিছু করেছে। কিন্তু সেই অহংকার জাতির জন্য ভালো কিছু বয়ে আনে না। সংস্কার ও বিচারের ম্যান্ডেট নিয়ে এই সরকার এসেছিল। গুম কমিশন বা মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশের মাধ্যমে যে অর্জনগুলো হয়েছে, তা ক্ষতিগ্রস্ত করা জনগণ মেনে নেবে না।

দুর্নীতি দমন কমিশনের অধ্যাদেশ সংশোধনের মাধ্যমে চেয়ারম্যান নিয়োগে সার্চ কমিটির ক্ষমতা খর্ব করা হচ্ছে অভিযোগ করে বিরোধীদলীয় এই হুইপ বলেন, সরকার যাকে ইচ্ছা তাকে নিয়োগ দেওয়ার ক্ষমতা নিতে চাইছে। একইভাবে পুলিশ কমিশনার এবং আইজিপি নিয়োগেও পেশাদারিত্বের চেয়ে সরকারের পছন্দকে প্রাধান্য দেওয়ার চেষ্টা চলছে। জামায়াত বলেছে, এসব সংশোধনী প্রস্তাব জুলাই চেতনার পরিপন্থি।

জুলাই সনদ মানার কথা বলছে সরকার
আইনমন্ত্রী আসাদুজ্জামান দাবি করেন, সরকার এখন পর্যন্ত জুলাই সনদের বাইরে পদক্ষেপ নেয়নি। তিনি বলেন, জুলাই সনদ সবার কাছে স্পর্শকাতর এবং সম্মানের। জুলাই সনদের শর্তই হলো ১ থেকে ৪৮ পর্যন্ত প্রস্তাব বাস্তবায়ন সংবিধান সংশোধন সাপেক্ষে।

তাহলে আপনারা কোনটাকে প্রাধান্য দেবেন– এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, সংবিধান ও জুলাই সনদকে প্রাধান্য দিচ্ছি। সংবিধান এবং জুলাই সনদকে এড়িয়ে কোনো কিছু করতে গেলে সেটা নিয়ে পরবর্তী বৈঠকে আলোচনা হবে।

গণভোটে বলা আছে; হ্যাঁ জয়যুক্ত হলে সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠিত হবে– এমন প্রশ্নের জবাবে আইনমন্ত্রী বলেন, ওইটা জুলাই সনদের পরিপন্থি।

গতকালের বৈঠকে কমিটির সভাপতি জয়নুল আবেদীনের সভাপতিত্বে আরও অংশ নেন সালাহউদ্দিন আহমেদ, নূরুল ইসলাম মনি, আসাদুজ্জামান, ড. মুহাম্মদ ওসমান ফারুক, এ এম মাহবুব উদ্দিন, জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী আব্দুল বারী, মুহাম্মদ নওশাদ জমির, সমাজকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী ফারজানা শারমীন, মুজিবুর রহমান, রফিকুল ইসলাম খান এবং জিএম নজরুল ইসলাম। বিশেষ আমন্ত্রণে উপস্থিত ছিলেন জামায়াতের দলীয় এমপি মোহাম্মদ নাজিবুর রহমান।

আরও পড়ুন