
এক বিশাল প্রত্যাশার চাপ নিয়ে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ বিজয় অর্জনের পর। গত মঙ্গলবার শপথ নেওয়ার পর গতকাল বুধবার অনুষ্ঠিত হয়েছে নতুন মন্ত্রিসভার প্রথম বৈঠক।
নতুন সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হতে যাচ্ছে ‘বাজার নিয়ন্ত্রণ’। গত কয়েক বছরে সিন্ডিকেট এবং মুদ্রাস্ফীতির কারণে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে গেছে। মন্ত্রিসভার প্রথম বৈঠকেই প্রধানমন্ত্রী স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, বাজার কারসাজির সঙ্গে যুক্ত কাউকেই ছাড় দেওয়া হবে না।
দীর্ঘ দেড় দশকের রাজনৈতিক নির্বাসন এবং অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের পর ক্ষমতায় আসা বিএনপি সরকারের সামনে এখন পাহাড়সম চ্যালেঞ্জ। বিশেষ করে জনজীবনের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত তিনটি বিষয় দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক করা এবং নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহ এই তিনটিকে অগ্রাধিকার দিয়ে সরকার তার পথচলা শুরু করেছে।
কৃষিপণ্য উৎপাদনকারী থেকে শুরু করে ভোক্তা পর্যন্ত পৌঁছাতে যে বিশাল চাঁদাবাজি ও সিন্ডিকেট কাজ করে, তা ভাঙা নতুন বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের জন্য বড় পরীক্ষা।
চিনি, তেল ও ডাল আমদানিতে গুটিকয়েক ব্যবসায়ীর আধিপত্য কীভাবে কমানো যায়, তা নিয়ে কাজ শুরু হয়েছে।
১৯ ফেব্রুয়ারি থেকেই পবিত্র রমজান শুরু হয়েছে। রমজানে পণ্যের চাহিদা বৃদ্ধির সুযোগ নিয়ে অসাধু ব্যবসায়ীরা যাতে দাম বাড়াতে না পারে, সে জন্য সারা দেশে বিশেষ টাস্কফোর্স গঠনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মনোবল ফিরিয়ে আনা এবং সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জন্য প্রধান কাজ। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান আজ সচিবালয়ে তিন বাহিনী প্রধানের (সেনা, নৌ ও বিমানবাহিনী) সঙ্গে সাক্ষাৎ করে এই বিষয়ে কঠোর বার্তা দিয়েছেন।
বিগত সরকারের আমলে বিতর্কিত হওয়া পুলিশ বাহিনীকে নতুন করে ঢেলে সাজানোর প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। পেশাদারিত্ব নিশ্চিত করতে এবং সাধারণ মানুষের বন্ধু হিসেবে পুলিশকে গড়ে তুলতে বিশেষ নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
অবৈধ অস্ত্রের ঝনঝনানি বন্ধে দেশব্যাপী বিশেষ অভিযান পরিচালনার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। আওয়ামী লীগ সমর্থিত ক্রিকেটার বা তারকাদের বিরুদ্ধে মামলা থাকলেও সেগুলো যেন প্রতিহিংসামূলক না হয় এবং আইনি প্রক্রিয়ায় সমাধান হয়, সেদিকে নজর দিচ্ছে সরকার। এটি আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ওপর সাধারণ মানুষের আস্থা বাড়াতে সহায়ক হবে।
বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রাণভোমরা হলো বিদ্যুৎ ও জ্বালানি। গত কয়েক বছরে লোডশেডিং এবং গ্যাসের অভাবে কলকারখানার উৎপাদন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে। তারেক রহমানের সরকার অগ্রাধিকার ভিত্তিতে জ্বালানি খাতকে গুরুত্ব দিচ্ছে।
গরমের মৌসুম শুরু হওয়ার আগেই বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোতে পর্যাপ্ত কয়লা ও এলএনজি সরবরাহ নিশ্চিত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
ভারতের আদানি গ্রুপসহ বিভিন্ন বিদেশি বিদ্যুৎ আমদানির চুক্তিগুলো জাতীয় স্বার্থে পর্যালোচনা করার পাশাপাশি দেশের নিজস্ব গ্যাস অনুসন্ধানে জোর দিচ্ছে নতুন সরকার।
বৃহস্পতিবার প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সচিবালয়ে তার দ্বিতীয় কার্যদিবস পার করেন। সচিবালয়ের মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে তিনি সেনাবাহিনীর প্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান, নৌবাহিনীর প্রধান অ্যাডমিরাল এম নাজমুল হাসান এবং বিমানবাহিনীর প্রধান এয়ার চিফ মার্শাল হাসান মাহমুদ খাঁনের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন। এই সাক্ষাৎ কেবল সৌজন্যমূলক ছিল না, বরং রাষ্ট্রের সার্বিক নিরাপত্তা এবং উন্নয়নমূলক কাজে সামরিক ও বেসামরিক প্রশাসনের মধ্যে সমন্বয় সাধনের একটি বার্তা ছিল।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এমন এক সময়ে দায়িত্ব নিয়েছেন যখন বিশ্বরাজনীতি এবং অর্থনীতি অত্যন্ত অস্থিতিশীল। একদিকে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন হামলার দামামা বাজছে (ইরান সংকট), যার প্রভাব পড়তে পারে জ্বালানি তেলের দামে। অন্যদিকে, দেশের ভেতর দীর্ঘদিনের জমানো ক্ষোভ ও সংস্কারের দাবি।
বিএনপি সরকারের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হলো একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ গঠন করা। আওয়ামী লীগ সমর্থিত খেলোয়াড় যেমন সাকিব আল হাসান বা মাশরাফী বিন মোর্ত্তজাকে ফিরিয়ে আনার জন্য ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী আমিনুল হকের যে ইতিবাচক ঘোষণা, তা মূলত ‘প্রতিহিংসা মুক্ত রাজনীতির’ একটি কৌশলগত বার্তা। তবে জনগণের ক্ষোভ প্রশমিত করে এদের স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনা সহজ হবে না।
তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকারের প্রথম সপ্তাহের কর্মকাণ্ডে একটি বিষয় পরিষ্কার তারা জনতুষ্টির চেয়ে জনদুর্ভোগ লাঘবকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। তবে ১৬ বছরের পুঞ্জীভূত সমস্যাগুলো মাত্র কয়েক দিনে সমাধান করা সম্ভব নয়। দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষা করতে হলে সরকারকে কেবল প্রশাসনিক কঠোরতা দেখালেই হবে না, বরং সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণও নিশ্চিত করতে হবে।
দেশের মানুষের চোখ এখন সচিবালয়ের দিকে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান যে তিনটি অগ্রাধিকার নির্ধারণ করেছেন, তার বাস্তবায়নই বলে দেবে এই সরকারের স্থায়িত্ব ও জনপ্রিয়তা কোন দিকে যাবে।
রিপোর্টার 















