ঢাকা ০৯:৩৫ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ৩১ অক্টোবর ২০২৬, ১৬ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

পরাগায়ন সংকটে হুমকিতে ৪০০ কোটি টাকার পেঁয়াজ বীজ

  • রিপোর্টার
  • আপডট টাইম : ০১:১২:০০ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৫ মার্চ ২০২৬
  • ৩৩২ পঠিত

পরাগায়ন সংকটে হুমকিতে ৪০০ কোটি টাকার পেঁয়াজ বীজ

দেশের মোট চাহিদার ৫০ শতাংশ পেঁয়াজ বীজ উৎপন্ন হয় ফরিদপুরে। মূল্যবান এই বীজকে ‘কালো সোনা’ বলা হয়। তবে গত কয়েক বছর ধরে মৌমাছির অভাবে কৃত্রিমভাবে পরাগায়ন করা হচ্ছে। প্রাকৃতিক পদ্ধতিতে পোকামাকড়ের মাধ্যমে পরাগায়নের পথ খুঁজছেন গবেষকরা। এতে আর্থিক সাশ্রয়ের পাশাপাশি বাঁচবের সময়ও।

প্রায় ২০ বছর ধরে ফরিদপুর অঞ্চল শীর্ষে রয়েছে পেঁয়াজ বীজ উৎপাদনে। মূল্যবান এই বীজ দেশের মোট চাহিদার সিংহ ভাগ পূরণ করে। আগে মৌমাছি কিংবা প্রজাপতির মাধ্যমে বীজের পরাগায়ন হতো। কিন্তু পেঁয়াজ বীজের ক্ষেতগুলোতে এখন আর আগের মতো দেখা মিলছে না মৌমাছি কিংবা প্রজাপতির।

সরেজমিনে মঙ্গলবার ফরিদপুর সদর উপজেলার অম্বিকাপুর, ভাষানচর ও গোবিন্দপুর মাঠে গিয়ে দেখা যায়, কৃষাণ-কৃষাণিরা হাত দিয়ে পেঁয়াজের কদম ফুলে ম্যাসেজ করছে। এই সময়টায় প্রতিদিন সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত শত শত কৃষি শ্রমিক বীজের ক্ষেতে ফুলের কদমে এভাবেই পরাগায়ন ঘটাচ্ছে।

ফরিদপুরে পেঁয়াজ বীজ চাষীরা জানালেন তাদের সমস্যার কথা। বললেন, বীজ উৎপাদন করতে প্রয়োজনীয় সার-বালাইনাশক সময় মতো পাওয়া যায় না, পাশাপাশি কয়েক বছর যাবৎ ক্ষেতে মৌমাছি আসছে না, যে কারণে হাত দিয়ে পরাগায়নের কাজ করছি, এতে খরচও বাড়ছে।

অম্বিকাপুর এলাকার সবচেয়ে বড় পেঁয়াজ বীজ চাষি সাহিদা বেগম। দুই বছর আগে কৃষিতে জাতীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত এই নারী জানান, ওই এলাকায় ৯০ একর জায়গায় তিনি এ বছর আবাদ করেছেন কালো সোনা। গত বছরের থেকে এবার আরও বেশি লেবার নিতে হয়েছে কৃত্রিম পরাগায়নের জন্য। একটি মৌমাছি ও নেই এবার খেতে। তাই, পুরোটাই হাত দিয়ে করতে হচ্ছে। ফুল মেসেজ করার এই লেবার বেশিরভাগই উত্তরবঙ্গ থেকে আনতে হয়। গত তিন বছর যাবত এই লেবারদের মাসখানেক আগে থেকেই ক্ষেত পরিচর্যায় রাখেন সাহিদা। তাদের থেকে বেছে বেছে প্রশিক্ষণ দিয়ে পরাগায়নের কাজে লাগান। এতে প্রতি শ্রমিককে দিতে হয় দিনে ৮০০ টাকা, খাবার খরচ দিতে হয়। ১০০০ টাকার মতো পড়ে যায় জনপ্রতি। ৫১ জন লেবার কাজ করছে তার পেঁয়াজের মাঠে। যদি ভালো দাম না পান পেঁয়াজের বীজের তাহলে অনেক টাকা লোকসান গুনতে হবে বলে আশঙ্কা তার।গবেষকরা যা বলছেন

পেঁয়াজ বীজ ক্ষেতে গিয়ে দেখা মেলে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন গবেষকের সাথে। তারা জানালেন, এই ক্ষেতগুলোতে কোনো মৌমাছি দেখতে পাচ্ছি না। এজন্য ক্ষেতে বেশী মাত্রায় ক্ষতিকর রাসায়নিক দ্রব্যের ব্যবহারই মূল কারণ বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে। চাষাবাদ পদ্ধতিতে পরিবর্তন আনতে হবে যাতে মৌমাছিগুলো প্রাকৃতিক উপায়ে পেঁয়াজ ফুলে আবার ফিরে আসে।

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় প্রাণী বিদ্যা বিভাগের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী ইতফেদার তাসনিন বলেন, কৃষি বিভাগকে আরও আন্তরিক হতে হবে যাতে চাষির আবার মৌমাছির পরাগায়নে ফিরে যেতে পারে। মৌমাছি পেয়াজ ফুলে না আসাটা জীব বৈচিত্রের জন্য হুমকি। আমরা চার জনের একটি দল এ ব্যাপারে আমাদের গবেষণার ফলাফল বিশ্ববিদ্যালয়ের মাধ্যমে কৃষি মন্ত্রণালয়ে শিঘ্রই জমা দেব।

কৃষি বিভাগের তথ্য বলছে চলতি মৌসুমে ফরিদপুর জেলায় পেঁয়াজ বীজ আবাদ হয়েছে ১৮শ’ ৬৫ হেক্টর জমিতে। উৎপাদিত হয়েছে ১১শ মেট্রিকটন বীজ, যার বাজার মূল্য সাড়ে ৩শ থেকে ৪শ কোটি টাকা। মৌমাছি চাষ উৎসাহিত করার পরামর্শ দিয়েছে কৃষি বিভাগ, একইসঙ্গে কম পরিমাণ রাসায়নিক বালাইনাশক ব্যবহারের পরামর্শ তাদের।

ফরিদপুর জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক কৃষিবিদ শাহাদুজ্জামান বলেন, দেশের অর্ধেক পেঁয়াজ বীজের চাহিদা পুরণ হয় এই জেলা থেকে। পেঁয়াজ বীজ উৎপাদনের জন্য মৌমাছির মাধ্যমে পরাগায়ন খুবই গুরুত্বপূর্ণ। অতিরিক্ত কীটনাশক ব্যবহার, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে মৌমাছির সংখ্যা কমে যাচ্ছে। আমরা ক্ষেতে প্রয়োজনের বেশি বালাইনাশক না দিতে বলছি। রাসায়নিক ওষুধ ব্যবহারের কারণে ফুলে মৌমাছি না বসায় হাত দিয়ে পরাগায়ন করতে হচ্ছে। সঠিক নিয়মে পরিমিত সার ও কীটনাশক ব্যবহার করাসহ মাঠে মৌবক্স স্থাপন করা হলে পরাগায়নসহ মধু আহরণ সম্ভব হবে।

আরো পড়ুন

জনপ্রিয় সংবাদ

ঝালকাঠির কাঠালিয়ায় বিভিন্ন প্রজাতির মাছের পোনা অবমুক্ত

পরাগায়ন সংকটে হুমকিতে ৪০০ কোটি টাকার পেঁয়াজ বীজ

আপডট টাইম : ০১:১২:০০ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৫ মার্চ ২০২৬

দেশের মোট চাহিদার ৫০ শতাংশ পেঁয়াজ বীজ উৎপন্ন হয় ফরিদপুরে। মূল্যবান এই বীজকে ‘কালো সোনা’ বলা হয়। তবে গত কয়েক বছর ধরে মৌমাছির অভাবে কৃত্রিমভাবে পরাগায়ন করা হচ্ছে। প্রাকৃতিক পদ্ধতিতে পোকামাকড়ের মাধ্যমে পরাগায়নের পথ খুঁজছেন গবেষকরা। এতে আর্থিক সাশ্রয়ের পাশাপাশি বাঁচবের সময়ও।

প্রায় ২০ বছর ধরে ফরিদপুর অঞ্চল শীর্ষে রয়েছে পেঁয়াজ বীজ উৎপাদনে। মূল্যবান এই বীজ দেশের মোট চাহিদার সিংহ ভাগ পূরণ করে। আগে মৌমাছি কিংবা প্রজাপতির মাধ্যমে বীজের পরাগায়ন হতো। কিন্তু পেঁয়াজ বীজের ক্ষেতগুলোতে এখন আর আগের মতো দেখা মিলছে না মৌমাছি কিংবা প্রজাপতির।

সরেজমিনে মঙ্গলবার ফরিদপুর সদর উপজেলার অম্বিকাপুর, ভাষানচর ও গোবিন্দপুর মাঠে গিয়ে দেখা যায়, কৃষাণ-কৃষাণিরা হাত দিয়ে পেঁয়াজের কদম ফুলে ম্যাসেজ করছে। এই সময়টায় প্রতিদিন সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত শত শত কৃষি শ্রমিক বীজের ক্ষেতে ফুলের কদমে এভাবেই পরাগায়ন ঘটাচ্ছে।

ফরিদপুরে পেঁয়াজ বীজ চাষীরা জানালেন তাদের সমস্যার কথা। বললেন, বীজ উৎপাদন করতে প্রয়োজনীয় সার-বালাইনাশক সময় মতো পাওয়া যায় না, পাশাপাশি কয়েক বছর যাবৎ ক্ষেতে মৌমাছি আসছে না, যে কারণে হাত দিয়ে পরাগায়নের কাজ করছি, এতে খরচও বাড়ছে।

অম্বিকাপুর এলাকার সবচেয়ে বড় পেঁয়াজ বীজ চাষি সাহিদা বেগম। দুই বছর আগে কৃষিতে জাতীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত এই নারী জানান, ওই এলাকায় ৯০ একর জায়গায় তিনি এ বছর আবাদ করেছেন কালো সোনা। গত বছরের থেকে এবার আরও বেশি লেবার নিতে হয়েছে কৃত্রিম পরাগায়নের জন্য। একটি মৌমাছি ও নেই এবার খেতে। তাই, পুরোটাই হাত দিয়ে করতে হচ্ছে। ফুল মেসেজ করার এই লেবার বেশিরভাগই উত্তরবঙ্গ থেকে আনতে হয়। গত তিন বছর যাবত এই লেবারদের মাসখানেক আগে থেকেই ক্ষেত পরিচর্যায় রাখেন সাহিদা। তাদের থেকে বেছে বেছে প্রশিক্ষণ দিয়ে পরাগায়নের কাজে লাগান। এতে প্রতি শ্রমিককে দিতে হয় দিনে ৮০০ টাকা, খাবার খরচ দিতে হয়। ১০০০ টাকার মতো পড়ে যায় জনপ্রতি। ৫১ জন লেবার কাজ করছে তার পেঁয়াজের মাঠে। যদি ভালো দাম না পান পেঁয়াজের বীজের তাহলে অনেক টাকা লোকসান গুনতে হবে বলে আশঙ্কা তার।গবেষকরা যা বলছেন

পেঁয়াজ বীজ ক্ষেতে গিয়ে দেখা মেলে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন গবেষকের সাথে। তারা জানালেন, এই ক্ষেতগুলোতে কোনো মৌমাছি দেখতে পাচ্ছি না। এজন্য ক্ষেতে বেশী মাত্রায় ক্ষতিকর রাসায়নিক দ্রব্যের ব্যবহারই মূল কারণ বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে। চাষাবাদ পদ্ধতিতে পরিবর্তন আনতে হবে যাতে মৌমাছিগুলো প্রাকৃতিক উপায়ে পেঁয়াজ ফুলে আবার ফিরে আসে।

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় প্রাণী বিদ্যা বিভাগের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী ইতফেদার তাসনিন বলেন, কৃষি বিভাগকে আরও আন্তরিক হতে হবে যাতে চাষির আবার মৌমাছির পরাগায়নে ফিরে যেতে পারে। মৌমাছি পেয়াজ ফুলে না আসাটা জীব বৈচিত্রের জন্য হুমকি। আমরা চার জনের একটি দল এ ব্যাপারে আমাদের গবেষণার ফলাফল বিশ্ববিদ্যালয়ের মাধ্যমে কৃষি মন্ত্রণালয়ে শিঘ্রই জমা দেব।

কৃষি বিভাগের তথ্য বলছে চলতি মৌসুমে ফরিদপুর জেলায় পেঁয়াজ বীজ আবাদ হয়েছে ১৮শ’ ৬৫ হেক্টর জমিতে। উৎপাদিত হয়েছে ১১শ মেট্রিকটন বীজ, যার বাজার মূল্য সাড়ে ৩শ থেকে ৪শ কোটি টাকা। মৌমাছি চাষ উৎসাহিত করার পরামর্শ দিয়েছে কৃষি বিভাগ, একইসঙ্গে কম পরিমাণ রাসায়নিক বালাইনাশক ব্যবহারের পরামর্শ তাদের।

ফরিদপুর জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক কৃষিবিদ শাহাদুজ্জামান বলেন, দেশের অর্ধেক পেঁয়াজ বীজের চাহিদা পুরণ হয় এই জেলা থেকে। পেঁয়াজ বীজ উৎপাদনের জন্য মৌমাছির মাধ্যমে পরাগায়ন খুবই গুরুত্বপূর্ণ। অতিরিক্ত কীটনাশক ব্যবহার, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে মৌমাছির সংখ্যা কমে যাচ্ছে। আমরা ক্ষেতে প্রয়োজনের বেশি বালাইনাশক না দিতে বলছি। রাসায়নিক ওষুধ ব্যবহারের কারণে ফুলে মৌমাছি না বসায় হাত দিয়ে পরাগায়ন করতে হচ্ছে। সঠিক নিয়মে পরিমিত সার ও কীটনাশক ব্যবহার করাসহ মাঠে মৌবক্স স্থাপন করা হলে পরাগায়নসহ মধু আহরণ সম্ভব হবে।

আরো পড়ুন